ইতিহাসের পরমাসুন্দরী নারী ‘রানী ক্লিওপেট্রা’, জানেন তার সম্পর্কে?

bdna8788746শতাব্দীর পর শতাব্দী সৌন্দর্য পুজারিদের অন্যতম উপাসনা যেই নারীকে নিয়ে, যার সৌন্দর্যের মায়াজালে আটকা পরেছে অনেক বাঘা বাঘা মানুষ সে আর কেও না, রানী ক্লিওপেট্রা। ক্লিওপেট্রা প্রাচীন মিসর এবং ইতিহাসের এক বিস্ময়কর নাম। ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত নারী তিনি।প্রত্যয়ী ক্ষমতা, সহজাত রসবোধ এবং প্রচণ্ড উচ্চাভিলাষ ও তা বাস্তবায়নের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি সর্বকালের সেরা মহিলাদের কাতারে স্থান করে নিয়েছেন। তাকে মনে করা হয় সম্মোহনী সৌন্দর্য আর সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে এবং সীমিত শক্তিকে অসাধারণ কৌশলে অসীমে নিয়ে যাওয়ার রূপকার হিসেবে।তবে আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে, পরমাসুন্দরী হিসেবে তার খুব বেশি খ্যাতি ছিল না। কিন্তু তীক্ষন বুদ্ধিমত্তাই ছিলো অন্যকে বশ করার মত।

সে সময়ে মিশরীয় মুদ্রায় অঙ্কিত করা হয় রানী ক্লিওপেট্রার ছবি । সেই ছবিতে ক্লিওপেট্রাকে পরমাসুন্দরী হিসেবে দেখা যায় না। তবে তার প্রসন্ন ভাব, স্পর্শকাতর নিখুঁত গ্রিসিয়ান মুখাবয়ব, গোলাকার দৃঢ় চিবুক, ধনুকের মতো ঢেউ খেলানো ভুরু যুগলের নিচে অদ্ভুত সুন্দর ভাসা ভাসা চোখ, প্রশস্ত ললাট আর সুতীক্ষন নাসিকার চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়। আর সৌন্দর্যে কিছুটা ঘাটতি থেকে থাকলেও প্রখর বুদ্ধিমত্তা, যেকোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেয়ার মতা, অপরকে বশ করার সামর্থ্য তাকে তুলনাহীন করে তুলেছিল।

প্রেম আর মৃত্যু এই নারীর জীবনে একাকার হয়ে গিয়েছিলো। তিনি যেমন ভালোবাসার উদ্যাম হাওয়া বইয়ে দিতে পারতেন, তেমনি প্রয়োজনে মারাত্মক হিংস্রও হতে পারতেন। পথের কাঁটা মনে করলে যে কাউকে নির্মমভাবে সরিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করতেন না। রোমান রাজনীতির অত্যন্ত সঙ্কটজনক অধ্যায়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সে যুগের নারীদের মতো সাদামাটা জীবন মেনে নেননি। বরং নিজেই ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। আর তাই শত বছর পরও তাকে স্মরণ করা হয়। তবে অন্য সব কিংবদন্তি চরিত্রের তুলনায় কিওপেট্রা ভিন্ন মাত্রা সৃষ্টি করেছেন। সবাই ইতিহাসের নানা পরিক্রমায় নানাভাবে আবির্ভূত হন। কিন্তু ক্লিওপেট্রা তার জীবিতকালেই শত্রু পক্ষেরনানা নেতিবাচক প্রচারণার শিকার হয়েছিলেন,যা এত বছর পর একটুও কমেনি। প্রতি যুগেই তার চরিত্রকে নানাভাবে রূপান্তরিত করা হয়েছে। কখনো তিনি শত্রু, কখনো স্বাধীনতাকামী, কখনো যৌন আবেদনময়ী নারী, কখনো খলনায়িকা নানা জনে নানা যুগে এভাবেই তাকে চিত্রিত করে চলেছে। এই কাজটি প্রয়োজনমতো কখনো রাজনীতিবিদ, কখনো সাহিত্যিক, কখনো চিত্রকর, কখনো বর্ণবাদী গোষ্ঠী, কখনো স্বাধীনতাকামীরা করেছেন।

এই একটি মহিলাকে নিয়ে যুগের পর যুগ ধরে অনেক বড় বড় সাহিত্যিক লিখে চলেছেন নানান উপাখ্যান। কেও লিখেছেন উপন্যাস, কেও গল্প, কেও কবিতা আবার কেও বা অমিত্রাক্ষর ছন্দ। এই তালিকায় যেমন আছে সেক্সপিয়ার, জর্জ বার্নড শ, হেনরি রাইডার হ্যাঁগারড এর মতো মহামহিম সাহিত্যিক, তেমনি আছে ড্রাইডেন প্লুটার্ক, ড্যানিয়েল সহ আরও অনেক সাহিত্যিক। এদের সবাই ক্লিওপেট্রার চারিত্রিক বিভিন্ন রুপ নিয়ে লিখেছেন তাদের উপাখ্যান, তবে সবাই চেষ্টা করেছেন ক্লিওপেট্রার ঐতিহাসিক অবস্থান যথাযথ রাখার। যেমন সেক্সপিয়ার তার এন্টোনিয়ও ক্লিওপেট্রা উপন্যাসে ধারালো লেখনির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন ক্লিওপেট্রার রূপ সেই সাথে তুলে ধরেছেন এন্টোনিয়ও ও ক্লিওপেট্রার রোম্যানটিসিসম। অন্যদিকে জর্জ বার্নড শ তার সিজার ক্লিওপেট্রা উপন্যাসে সিজার এবং ক্লিওপেট্রার রোম্যানটিসিসম তুলে ধরেছেন। তবে হেনরি রাইডার হ্যাঁগারড তার উপন্যাস ক্লিওপেট্রা তে অসাধারণ ভাবে তুলে ধরেছেন ক্লিওপেট্রার ব্যাক্তিত্ব, উচ্চাভিলাস ও কিছুটা নারী সুলভ অসহায়ত্ব।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত নারী শাসক ক্লিওপেট্রার জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৬৯ সালে প্রাচীন মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায়।সাধারণভাবে তিনি ক্লিওপেট্রা সপ্তম হিসেবে পরিচিত। মেসিডোনিয়ান বংশোদ্ভূত সপ্তম মিসরীয় রানী হওয়ায় তাকে এই পরিচিতি বহন করতে হয়।তার আগে আরো ছয়জন কিওপেট্রা ছিলেন।  অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে খ্রিস্টপূর্ব ৫১ অব্দে রোম সম্রাট টলেমি অলেতিস মারা গেলেন। মারা যাওয়ার আগে তার বিশাল সাম্রাজ্য ১৮ বছর বয়সী কন্যা ক্লিওপেট্রা ও ১৮ বছর বয়সী পুত্র টলোমকে উইল করে দিয়ে যান। সেই সঙ্গে মৃত্যুর সময় রোমান নেতা পম্পে-কে রাজ্য ও তার সন্তানদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব দিয়ে যান। তখনকার মিসরীয় আইন অনুসারে দ্বৈত শাসনের নিয়মে রানী ক্লিওপেট্রার একজন নিজস্ব সঙ্গী থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। কাজেই ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করতে হয় তারই ছোটভাই টলেমিকে, তখন  টলেমির বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। ফলে আইনগতভাবে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পিত হলো ক্লিওপেট্রা এবং তার স্বামী ১২ বছর বয়সী ছোট ভাই টলেমি এর উপর। ক্ষমতায় আরোহণের পর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও ক্লিওপেট্রা তার শাসন চালিয়ে গেলেন। এরই মধ্যে ৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে ফারসালুসের যুদ্ধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাপতি পম্পে পরাজিত হলেন। সে বছরই আলেকজান্দ্রিয়ায় ফেরার পথে ফারসালুসের হাতে নিহত হন। যুদ্ধ থেকে পালাতে গিয়ে ক্লিওপেট্রার স্বামী ও ভাই টলেমি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর ক্লিওপেট্রা হয়ে ওঠেন মিসরের একচ্ছত্র রানী।

এরমধ্যেই পটভূমিতে আবির্ভাব ঘটলো রোমের পরাক্রমশালী বীর মার্ক অ্যান্টনির। লোকমুখে তিনি ক্লিওপেট্রার রূপ-লাবণ্যের কথা শুনেছিলেন। কিন্তু কিভাবে সেই রূপ-লাবণ্য চাক্ষুষ করবেন? একদিন তিনি রোম থেকে এসে হাজির হলেন ক্লিওপেট্রার কারুকার্যশোভিত প্রাসাদের সামনে। এই খবর গোপন থাকার কথা নয়। দ্রুতই বীর অ্যান্টনির আগমনের খবর পেয়ে গেলেন রানী ক্লিওপেট্রা। মার্ক অ্যান্টনির কথা তিনিও শুনেছেন আগেই। সেই শুরু। অবশ্য কারও কারও মতে মিসর আক্রমণ করতে এসে ক্লিওপেট্রার প্রেমে পড়ে যান রোমান বীর অ্যান্টনি। তবে উভয়ক্ষেত্রেই প্রথম দর্শনেই একে অন্যের প্রেমে পড়ে যান বলে মনে করা হয়। অ্যান্টনির ক্ষেত্রে ব্যাপারটা প্রকট রূপ নিল। শক্তিশালী রোমান বীর যেন ক্লিওপেট্রার ললিতবিভাসে মোমের মতো গলতে লাগলেন। কেবলই অপলক তাকিয়ে থাকা। যতই দেখেন, ততই দেখার আকর্ষণ বেড়ে যায়। চোখের তৃপ্তি হয় না যেন কিছুতেই। এরপর একে অন্যের মধ্যে দেখতে লাগলেন তাদের পরবর্তী জীবন। মার্ক অ্যান্টনি মশগুল ক্লিওপেট্রার প্রেমে। আর ক্লিওপেট্রাও নিঃসঙ্গ জীবনে কেবল একটি সঙ্গীই নয়, বরং তার সিংহাসন রক্ষায় এক পরাক্রমশালী বীরের সমর্থন পেয়ে গেলেন। তারপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলে অ্যান্টনিওর জীবন।অ্যান্টানিও বিবাহিত ছিলেন । তার পতœী ফুলভিয়ার মৃত্যু এবং পম্পের বিদ্রোহ ঘোষণা এলোমেলো করে দিল বীর অ্যান্টনির সুবর্ণ সময়কে। তখন গৃহযুদ্ধে রীতিমতো বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো রোম। এরপর গল্পে ভিন্নমাত্রা যোগ হয়। এর মধ্যেই ক্লিওপেট্রার জীবনে আবির্ভাব ঘটে মধ্যবয়সী বীর জুলিয়াস সিজারের। এলোমেলো মুহূর্তে সিজারকেও আকড়ে ধরেন ক্লিওপেট্রা। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। একসময় অসহায় অ্যান্টনি আত্মহত্যা করেন। সবকিছুর পরিণামে ক্লিওপেট্রাও সাধের জীবন ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

মাত্র ৩৯ বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। এই স্বল্প সময়েই তিনি একের পর এক নাটকীয় ঘটনার সৃষ্টি করেন। সে যুগের কোনো পুরুষের পক্ষেও যে ধরনের কাজ করা ছিল প্রায় অসম্ভব, তিনি সেসব কাজেরও আঞ্জাম দিয়েছেন। ইতিহাস ও নাটকে তার ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। বিশ্ববিখ্যাত অনেক সাহিত্যিকই তাকে নিয়ে কালজয়ী উপাখ্যান রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে আছে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘অ্যান্টনি অ্যান্ড কিওপেট্রা’, জর্জ বার্নাড শর ‘সিজার কিওপেট্রা’, জন ড্রাইডেনের ‘অল ফর লাভ’, হেনরি হ্যাগার্ডের ‘ক্লিওপেট্রা’। অনেক কাহিনীতে ভালো দিকের চেয়ে খারাপ দিককেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। হ্যালিওয়েল তাকে ‘দ্য উইকেডেস্ট উইম্যান ইন দ্য হিস্ট্রি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। দান্তের মতে, লালসার শাস্তি হিসেবে কিওপেট্রা নরকের দ্বিতীয় স্তরে দাউ দাউ করে পুড়ছেন। কারো কারো দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন ‘সারপেন্ট অব দ্য নাইল’। অনেকেই তার যৌন আবেদনময়ী দিকটিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। পশ্চিমা লেখকদের অনেকেই তাকে এশিয়ান হিসেবে এবং এশিয়ানদের সব কিছুই যে খারাপ তা বোঝানোর জন্যও তার নেতিবাচক দিকগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছেন বা তাদের উর্বর মস্তিষ্কে অনেক কিছু আবিষ্কৃতও হয়েছে। তা ছাড়া অক্টাভিয়ান তার বিজয়ের পর যাতে শুধু রোমানদের লেখা ইতিহাসই টিকে থাকে সে জন্য মিসরের প্রায় দুই হাজার নথিপত্র পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ কারণেও প্রকৃত ইতিহাস অনেকাংশেই পাওয়া যায় না।

রোমান সূত্র থেকে শুরু করে পরবর্তীতেও বলা হয় বিষাক্ত সাপের কামড়ে রানী ক্লিওপেট্রার মৃত্যু হয়। কথিত আছে ক্লিওপেট্রা আত্মঘাতী হয়েছিলেন বিষাক্ত ওই সাপ দিয়ে নিজের গায়ে ছোবল মারিয়ে। কিন্তু ম্যানচেস্টার যাদুঘরের মিশর বিষয়ক দুই বিশেষজ্ঞ জয়েস টিলডেসলি এবং অ্যান্ড্রু গ্রে বলছেন বিষাক্ত ওই ছোবলের জন্য যে গোখরো সাপকে দায়ী করা হয় ফলের ঝুড়িতে লুকিয়ে থাকার জন্য তার আকার বেশি বড় ছিল। এধরনের গোখরো সাপ সাধারণত ৫ থেকে ৬ ফুট লম্বা হয়ে থাকে, এমনকী তারা ৮ ফুট লম্বাও হয়। কাজেই রানীর মৃত্যুর এই প্রচলিত ব্যাখ্যা তারা অবাস্তব বলে নাকচ করে দিয়েছেন।তারা আরও বলছেন খুবই অল্প সময়ের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু ওই একই সাপের ছোবল থেকে সম্ভব নয়।”গোখরো সাপ শুধু আকারেই বিশাল নয়, পরপর তিনটি ছোবলেই বিষ উগরে মারণ কামড় দেওয়াও এধরনের সাপের আচরণ বর্হিভূত,” বলেছেন মিঃ গ্রে।”গোখরো অবশ্যই বিষধর সাপ এবং গোখরোর কামড়ে মৃত্যুও সম্ভব, কিন্তু সেই মৃত্যু আরো ধীরে ঘটে থাকে। কাজেই একের পর এক ক্লিওপেট্রা ও তার দুই দাসী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।”তারা বলছেন গোখরো সাপসহ সব সাপই নিজেদের রক্ষা করার এবং শিকার করার জন্য বিষ তৈরি করে। কিন্তু ওই বিষ তারা জমিয়ে রাখে প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য।

[ বিঃ দ্রঃ প্রতিদিন মজার মজার রান্নাকরার অসাধারন সব রেসিপি এবং রুপ লাবণ্য টিপস আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে আমাদের পেইজে লাইক দিন!

আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিতে এইখানে ক্লিক করুন

Updated: April 21, 2016 — 10:32 am
bangladeshi women's lifestyle © 2015-2016, ই-মেইলঃ bdnari.com@gmail.com Serverdokan TEAM